• বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
  • ঢাকা, বাংলাদেশ
ইউক্রেনে রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন রুশ-মার্কিন প্রক্সিযুদ্ধ
ইউক্রেনে রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন রুশ-মার্কিন প্রক্সিযুদ্ধ

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

শনিবার, ২ এপ্রিল ২০২২  |  অনলাইন সংস্করণ

২৪ ফ্রেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের পর সেখানে কার্যত রুশ-মার্কিন প্রক্সিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার বলয়ভুক্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইউক্রেনের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রুশ-বিরোধী যুদ্ধ চালাচ্ছে। তারা ইউক্রেনে বিপুল অস্ত্র পাঠাচ্ছে। রাশিয়ার ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে তাদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার ও যুদ্ধ-প্রচার চালাচ্ছে। জাতিসংঘকে ব্যবহার করছে। তাদের লক্ষ্য ইউরোপে তাদের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়াকে এ যুদ্ধে যতটা সম্ভব কাবু করা। তাকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলা। এবং ন্যাটোকেও সার্বিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। রাশিয়ার আগ্রাসনে এবং মার্কিন-ন্যাটোর যুদ্ধ-চক্রান্তে ইউক্রেন শ্মশানে পরিণত হচ্ছে। বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। সম্পদ, অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হচ্ছে। মানুষ খাবার পাচ্ছেন না। তাদের বাসাবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে। তারা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন। মার্চের ২৫ তারিখ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ইউক্রেনের জনসংখ্যা হলো সাড়ে চার কোটির মতো। শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থরা চরম সংকটাবস্থায় রয়েছেন। এই অন্যায় যুদ্ধটা হঠাৎ করে হচ্ছে না। তার কিছু পূর্ব ইতিহাস রয়েছে। যারই ধারাবাহিকতায় এ যুদ্ধ।

১৯১৭ সালে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রভাবে ইউক্রেনেও বলশেভিক পার্টি গড়ে উঠেছিল। ১৯১৯ সালে বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বাধীন লাল ফৌজ ইউক্রেনের প্রতিবিপ্লবী সরকারকে বিপ্লবের মধ্যদিয়ে উচ্ছেদ করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ইউক্রেনীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি প্রতিষ্ঠাকালীন প্রজতন্ত্র হিসেবে ইউক্রেন অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫৪ সাল থেকে ক্রুশ্চেভের সংশোধনবাদের হাত ধরে এই সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমে পুঁজিবাদ ও পরে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। তারপরও ইউক্রেন ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সময়ে সাম্রাজ্যবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নে রুশ জাতীয়তাবাদের বিকাশের মধ্যদিয়ে সোভিয়েত ফেডারেশনের ভিত্তিতে অন্যান্য জাতিসমূহের ওপর নিপীড়নমূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়। যে কারণে অন্যান্য জাতিসমূহের পৃথক হওয়ার বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। ১৯৯০ সালে সোভিয়েতের পতনকালে অন্য আরো ১৩টি রাজ্যের সাথে ইউক্রেনও পৃথক রাষ্ট্র গঠন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে অনেকগুলো মার্কিন ঘেঁষা রাষ্ট্র গঠনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ব্লকেরও বিরাট ভূমিকা ছিল। তৎকালে বিশ্ব-প্রভুত্বে মার্কিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়াকে দুর্বল করার এই ষড়যন্ত্রকে তখন রাশিয়া নিজ দুর্বলতার কারণে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।  ইউক্রেন পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার পর দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। ইউক্রেনের পশ্চিমে অবস্থিত পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি। দক্ষিণ-পশ্চিমে রোমানিয়া ও মালদোভা, দক্ষিণে কৃষ্ণ সাগর ও আজভ সাগর, পূর্বে ও উত্তর-পূর্বে রাশিয়া এবং উত্তরে বেলারুশ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন জোটভুক্ত দেশগুলো তাদের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি রাশিয়ার কাছ থেকে পেয়ে থাকে। পূর্ব ইউরোপের ৪টি দেশে শতভাগ জ্বালানি রাশিয়া সরবারাহ করে। জার্মানিতে করে শতকরা ৫৫ ভাগ। এই জ্বালানি সরবরাহের পথ ইউক্রেনের মধ্যদিয়ে বিস্তৃত। তাছাড়া সারা বছর গরম পানির সরবরাহের জন্য ইউক্রেনের সেবাস্তাপোল বন্দরের ওপরও রাশিয়া  নির্ভরশীল।  অতীতের সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সুফল হিসেবে ইউক্রেনে ফসলের ৭৩% খামারে উৎপাদন হয়। যে কারণে দেশের খাদ্য চাহিদা পুরণ করেও পৃথিবীতে ভূট্টা রপ্তানিতে ৪র্থ ও গম রপ্তানিতে ৬ষ্ঠ স্থান দখল করে আছে। অর্থাৎ ভাষা ও জাতিগত কিছু প্রভাব ছাড়া দেশটিকে কোনো ক্ষেত্রেই রাশিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয় না। সেজন্য ইউক্রেনীয় ভাষাভাষী বুর্জোয়াদের রুশ সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব থেকে বেরিয়ে ইউরোপের দিকে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা সর্বদাই বিরাজ করে। এটাকে কাজে লাগাচ্ছে মার্কিনের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট।  কমরেড লেনিন ও কমরেড স্ট্যালিনের সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে রুশ সাম্রাজ্যভুক্ত জাতিসমূহ স্বেচ্ছায় যোগদান করেছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতার অধিকারের নীতির ভিত্তিতে। যার ফলে বৃহৎ রাষ্ট্রের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে যুক্ত থেকে জাতিসমূহ সমৃদ্ধিলাভ করেছিল।  ১৯৯০ সালে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতন হলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও সামরিক ইউনিট ইউক্রেনের অংশে চলে যায়। ১৯৯১ সালে পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ ন্যাটো জোটে যোগ দেয়। সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ভেঙ্গে গিয়ে তার অন্তর্ভুক্ত প্রজাতন্ত্রগুলো দুর্বল হয়ে গেলেও রুশ সাম্রাজ্যবাদ একটি বৃহৎ শক্তি হিসেবে তার অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের আলখাল্লা সম্পূর্ণ বর্জন করে উগ্র রুশ জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে তারা পুনর্গঠিত হতে থাকে। বুর্জোয়া উদারনৈতিক গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্রের পক্ষে সকল উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাকে হিটলারের ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমন ও নিয়ন্ত্রণ করে। মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোও তখন রুশ সাম্রাজ্যবাদের ফ্যাসিবাদী বিকাশে মদদ ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এই সুযোগকে সবচেয়ে বেশি দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে কাজে লাগাতে সক্ষম হয় রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়ে উঠেছিল।  চীনের সঙ্গে মার্কিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ার পরিস্থিতিতে চীনকে রাশিয়ার পাশে পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা সফল হয়েছে। এসবের মধ্যদিয়ে রুশ সাম্রাজ্যবাদ মার্কিন ও ইইউ, অর্থাৎ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সেজন্য সোভিয়েতভুক্ত পুরানো রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও দখল বজায় রাখা বা ন্যাটোভুক্তদের নিজ বলয়ে টেনে আনা রাশিয়ার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটের  বাইরে  রাখতে  রাশিয়ার আগ্রাসন এই পরিকল্পনারই  অংশ।  ২০১৪ সাল পর্যন্ত রুশপন্থি ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইঙ্গ-মার্কিন ও ইউরোপীয়দের প্রভাবিত অভ্যুত্থানের জেরে প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ পদত্যাগে বাধ্য হয়। এবং মার্কিনপন্থি জেলেনস্কি সরকার ক্ষমতায় বসে।  উল্লেখ্য, ১৭৯৩ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ক্রিমিয়াও রাশিয়ারই অংশ ছিল। ১৯৫৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন ইউক্রেনীয় অধিবাসী প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চভ রুশ ভাষাভাষী অধ্যুষিত ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের কাছে উপহার হিসেবে ছেড়ে দিয়েছিল। উল্লেখ্য যে, তখন ইউক্রেন একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায় তখন এই ক্রিমিয়া চলে যায় ইউক্রেনের ভাগে, যা রাশিয়ার জন্য ছিল একটি বড় আঘাত। ২০১৪ সালে, ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ইউক্রেনের কৃষ্ণ সাগরীয় উপদ্বীপ ক্রিমিয়া  উপদ্বীপ  দখল  করে নেয় পুতিনের রাশিয়া।   কাজেই ইউক্রেন যে ন্যাটোর সদস্য হবে, সেটা রাশিয়া কোনোভাবেই মানবে না। শুধু তাই নয়, একই বছর রুশপন্থি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে ইউক্রেনের পূর্ব সীমান্তের ডোনবাস অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় রাশিয়া। ক্রিমিয়া দখলের পর ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার নৌবাহিনী কৃষ্ণমহাসাগর বহরের গুরুত্বপূর্ণ একটি  ঘাঁটি স্থাপন করে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর ইউক্রেনের ইতিহাস থেকে সোভিয়েত ও রুশ সংস্কৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা চলছিল বারবার। ২০১৪ সালের পর তা আরও বেগবান হয়। বর্তমানে বিভিন্ন পার্ক আর জাদুঘর থেকে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে সাবেক সোভিয়েত আমলের ইতিহাস সংবলিত বিভিন্ন উপকরণ। রুশ সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেক আনুষ্ঠানিকতা বাতিল করা হচ্ছে। রুশ সাম্রাজ্যবাদও সমাজতান্ত্রিক সকল অর্জন ও ঐতিহ্যসমূহ  ধ্বংস করেছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, ইউক্রেন এসব ধ্বংস করে ইউরোপ ও আমেরিকার দিকে ঝুঁকছে। রাশিয়ার সংকট ও বিরোধিতা সেখানেই। রাশিয়া যে করেই হোক, মার্কিন-ইউরোপীয় বলয় থেকে দূরে রাখার অংশ হিসেবে বিভিন্ন উপায়ে ইউক্রেনের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা জারি রেখেছে। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য চাই তাদের মতাবলম্বির  কাউকে, যাকে ক্ষমতায়  বসিয়ে  তাদের উদ্দেশ্য  সাধন  করা  যায়।  বাহ্যত রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ করছে এমনটা দেখা গেলেও বাস্তবে তা মার্কিনের নেতৃত্বে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ ও রুশ-চীন সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের মধ্যকার যুদ্ধ। ইউক্রেনের বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির প্রধান অংশটি জেলেনস্কির নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের পক্ষে যুদ্ধ করছে। এবং রুশপন্থি জাতীয়তাবাদীরা পুতিন-রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করছে। ইউক্রেন ও রাশিয়ার নিপীড়িত-জাতি জনগণের এখানে কোনো স্বার্থ নেই। বিশ্বের নিপীড়িত, মুক্তিকামী  জাতি- জনগণের এই দুই সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের উচ্ছেদের সংগ্রাম গড়ে তোলার দাবি তুলতে হবে। 

ইউক্রেনে রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন রুশ-মার্কিন প্রক্সিযুদ্ধ

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
শনিবার, ২ এপ্রিল ২০২২  |  অনলাইন সংস্করণ

২৪ ফ্রেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের পর সেখানে কার্যত রুশ-মার্কিন প্রক্সিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার বলয়ভুক্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইউক্রেনের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রুশ-বিরোধী যুদ্ধ চালাচ্ছে। তারা ইউক্রেনে বিপুল অস্ত্র পাঠাচ্ছে। রাশিয়ার ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে তাদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার ও যুদ্ধ-প্রচার চালাচ্ছে। জাতিসংঘকে ব্যবহার করছে। তাদের লক্ষ্য ইউরোপে তাদের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়াকে এ যুদ্ধে যতটা সম্ভব কাবু করা। তাকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলা। এবং ন্যাটোকেও সার্বিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। রাশিয়ার আগ্রাসনে এবং মার্কিন-ন্যাটোর যুদ্ধ-চক্রান্তে ইউক্রেন শ্মশানে পরিণত হচ্ছে। বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। সম্পদ, অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হচ্ছে। মানুষ খাবার পাচ্ছেন না। তাদের বাসাবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে। তারা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন। মার্চের ২৫ তারিখ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ইউক্রেনের জনসংখ্যা হলো সাড়ে চার কোটির মতো। শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থরা চরম সংকটাবস্থায় রয়েছেন। এই অন্যায় যুদ্ধটা হঠাৎ করে হচ্ছে না। তার কিছু পূর্ব ইতিহাস রয়েছে। যারই ধারাবাহিকতায় এ যুদ্ধ।

১৯১৭ সালে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রভাবে ইউক্রেনেও বলশেভিক পার্টি গড়ে উঠেছিল। ১৯১৯ সালে বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বাধীন লাল ফৌজ ইউক্রেনের প্রতিবিপ্লবী সরকারকে বিপ্লবের মধ্যদিয়ে উচ্ছেদ করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ইউক্রেনীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি প্রতিষ্ঠাকালীন প্রজতন্ত্র হিসেবে ইউক্রেন অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫৪ সাল থেকে ক্রুশ্চেভের সংশোধনবাদের হাত ধরে এই সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমে পুঁজিবাদ ও পরে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। তারপরও ইউক্রেন ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সময়ে সাম্রাজ্যবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নে রুশ জাতীয়তাবাদের বিকাশের মধ্যদিয়ে সোভিয়েত ফেডারেশনের ভিত্তিতে অন্যান্য জাতিসমূহের ওপর নিপীড়নমূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়। যে কারণে অন্যান্য জাতিসমূহের পৃথক হওয়ার বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। ১৯৯০ সালে সোভিয়েতের পতনকালে অন্য আরো ১৩টি রাজ্যের সাথে ইউক্রেনও পৃথক রাষ্ট্র গঠন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে অনেকগুলো মার্কিন ঘেঁষা রাষ্ট্র গঠনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ব্লকেরও বিরাট ভূমিকা ছিল। তৎকালে বিশ্ব-প্রভুত্বে মার্কিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়াকে দুর্বল করার এই ষড়যন্ত্রকে তখন রাশিয়া নিজ দুর্বলতার কারণে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।  ইউক্রেন পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার পর দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। ইউক্রেনের পশ্চিমে অবস্থিত পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি। দক্ষিণ-পশ্চিমে রোমানিয়া ও মালদোভা, দক্ষিণে কৃষ্ণ সাগর ও আজভ সাগর, পূর্বে ও উত্তর-পূর্বে রাশিয়া এবং উত্তরে বেলারুশ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন জোটভুক্ত দেশগুলো তাদের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি রাশিয়ার কাছ থেকে পেয়ে থাকে। পূর্ব ইউরোপের ৪টি দেশে শতভাগ জ্বালানি রাশিয়া সরবারাহ করে। জার্মানিতে করে শতকরা ৫৫ ভাগ। এই জ্বালানি সরবরাহের পথ ইউক্রেনের মধ্যদিয়ে বিস্তৃত। তাছাড়া সারা বছর গরম পানির সরবরাহের জন্য ইউক্রেনের সেবাস্তাপোল বন্দরের ওপরও রাশিয়া  নির্ভরশীল।  অতীতের সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সুফল হিসেবে ইউক্রেনে ফসলের ৭৩% খামারে উৎপাদন হয়। যে কারণে দেশের খাদ্য চাহিদা পুরণ করেও পৃথিবীতে ভূট্টা রপ্তানিতে ৪র্থ ও গম রপ্তানিতে ৬ষ্ঠ স্থান দখল করে আছে। অর্থাৎ ভাষা ও জাতিগত কিছু প্রভাব ছাড়া দেশটিকে কোনো ক্ষেত্রেই রাশিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয় না। সেজন্য ইউক্রেনীয় ভাষাভাষী বুর্জোয়াদের রুশ সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব থেকে বেরিয়ে ইউরোপের দিকে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা সর্বদাই বিরাজ করে। এটাকে কাজে লাগাচ্ছে মার্কিনের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট।  কমরেড লেনিন ও কমরেড স্ট্যালিনের সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে রুশ সাম্রাজ্যভুক্ত জাতিসমূহ স্বেচ্ছায় যোগদান করেছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতার অধিকারের নীতির ভিত্তিতে। যার ফলে বৃহৎ রাষ্ট্রের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে যুক্ত থেকে জাতিসমূহ সমৃদ্ধিলাভ করেছিল।  ১৯৯০ সালে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতন হলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও সামরিক ইউনিট ইউক্রেনের অংশে চলে যায়। ১৯৯১ সালে পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ ন্যাটো জোটে যোগ দেয়। সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ভেঙ্গে গিয়ে তার অন্তর্ভুক্ত প্রজাতন্ত্রগুলো দুর্বল হয়ে গেলেও রুশ সাম্রাজ্যবাদ একটি বৃহৎ শক্তি হিসেবে তার অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের আলখাল্লা সম্পূর্ণ বর্জন করে উগ্র রুশ জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে তারা পুনর্গঠিত হতে থাকে। বুর্জোয়া উদারনৈতিক গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্রের পক্ষে সকল উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাকে হিটলারের ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমন ও নিয়ন্ত্রণ করে। মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোও তখন রুশ সাম্রাজ্যবাদের ফ্যাসিবাদী বিকাশে মদদ ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এই সুযোগকে সবচেয়ে বেশি দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে কাজে লাগাতে সক্ষম হয় রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়ে উঠেছিল।  চীনের সঙ্গে মার্কিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ার পরিস্থিতিতে চীনকে রাশিয়ার পাশে পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা সফল হয়েছে। এসবের মধ্যদিয়ে রুশ সাম্রাজ্যবাদ মার্কিন ও ইইউ, অর্থাৎ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সেজন্য সোভিয়েতভুক্ত পুরানো রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও দখল বজায় রাখা বা ন্যাটোভুক্তদের নিজ বলয়ে টেনে আনা রাশিয়ার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটের  বাইরে  রাখতে  রাশিয়ার আগ্রাসন এই পরিকল্পনারই  অংশ।  ২০১৪ সাল পর্যন্ত রুশপন্থি ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইঙ্গ-মার্কিন ও ইউরোপীয়দের প্রভাবিত অভ্যুত্থানের জেরে প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ পদত্যাগে বাধ্য হয়। এবং মার্কিনপন্থি জেলেনস্কি সরকার ক্ষমতায় বসে।  উল্লেখ্য, ১৭৯৩ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ক্রিমিয়াও রাশিয়ারই অংশ ছিল। ১৯৫৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন ইউক্রেনীয় অধিবাসী প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চভ রুশ ভাষাভাষী অধ্যুষিত ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের কাছে উপহার হিসেবে ছেড়ে দিয়েছিল। উল্লেখ্য যে, তখন ইউক্রেন একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায় তখন এই ক্রিমিয়া চলে যায় ইউক্রেনের ভাগে, যা রাশিয়ার জন্য ছিল একটি বড় আঘাত। ২০১৪ সালে, ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ইউক্রেনের কৃষ্ণ সাগরীয় উপদ্বীপ ক্রিমিয়া  উপদ্বীপ  দখল  করে নেয় পুতিনের রাশিয়া।   কাজেই ইউক্রেন যে ন্যাটোর সদস্য হবে, সেটা রাশিয়া কোনোভাবেই মানবে না। শুধু তাই নয়, একই বছর রুশপন্থি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে ইউক্রেনের পূর্ব সীমান্তের ডোনবাস অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় রাশিয়া। ক্রিমিয়া দখলের পর ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার নৌবাহিনী কৃষ্ণমহাসাগর বহরের গুরুত্বপূর্ণ একটি  ঘাঁটি স্থাপন করে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর ইউক্রেনের ইতিহাস থেকে সোভিয়েত ও রুশ সংস্কৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা চলছিল বারবার। ২০১৪ সালের পর তা আরও বেগবান হয়। বর্তমানে বিভিন্ন পার্ক আর জাদুঘর থেকে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে সাবেক সোভিয়েত আমলের ইতিহাস সংবলিত বিভিন্ন উপকরণ। রুশ সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেক আনুষ্ঠানিকতা বাতিল করা হচ্ছে। রুশ সাম্রাজ্যবাদও সমাজতান্ত্রিক সকল অর্জন ও ঐতিহ্যসমূহ  ধ্বংস করেছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, ইউক্রেন এসব ধ্বংস করে ইউরোপ ও আমেরিকার দিকে ঝুঁকছে। রাশিয়ার সংকট ও বিরোধিতা সেখানেই। রাশিয়া যে করেই হোক, মার্কিন-ইউরোপীয় বলয় থেকে দূরে রাখার অংশ হিসেবে বিভিন্ন উপায়ে ইউক্রেনের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা জারি রেখেছে। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য চাই তাদের মতাবলম্বির  কাউকে, যাকে ক্ষমতায়  বসিয়ে  তাদের উদ্দেশ্য  সাধন  করা  যায়।  বাহ্যত রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ করছে এমনটা দেখা গেলেও বাস্তবে তা মার্কিনের নেতৃত্বে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ ও রুশ-চীন সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের মধ্যকার যুদ্ধ। ইউক্রেনের বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির প্রধান অংশটি জেলেনস্কির নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের পক্ষে যুদ্ধ করছে। এবং রুশপন্থি জাতীয়তাবাদীরা পুতিন-রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করছে। ইউক্রেন ও রাশিয়ার নিপীড়িত-জাতি জনগণের এখানে কোনো স্বার্থ নেই। বিশ্বের নিপীড়িত, মুক্তিকামী  জাতি- জনগণের এই দুই সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের উচ্ছেদের সংগ্রাম গড়ে তোলার দাবি তুলতে হবে। 

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র